হার্ট অ্যাটাকের নীরব দাওয়াই সকালে লুকিয়ে!
ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় ভোজরাজ জানিয়েছেন, ভোর থেকে সকাল ৭টা থেকে ১১টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ে ঘুম ভাঙার পর শরীরের ভেতরে একাধিক পরিবর্তন ঘটে— কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, রক্তচাপ হঠাৎ চড়তে থাকে, প্লেটলেট আঠালো হয়ে ওঠে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা নীরবে প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষজ্ঞের দাবি, এ কারণেই সকালকে ‘রিস্ক আওয়ার’ বলা হয়।
ব্যস্ততার চাপে সকালেই ভুলভ্রান্তি
আজকের যুগ গতি আর তাড়াহুড়োর। অফিসযাত্রীদের অনেকেই ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই কফি বা চায়ের জন্য ছুটে যান। কেউ আবার খালি পেটে ই-মেল চেক করা শুরু করেন, কেউ বা জলখাবার বাদ দিয়ে সরাসরি কাজে লেগে পড়েন। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন— এসব আচরণ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে সকালের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় শরীর যে অস্বাভাবিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়, তার সঙ্গে এই অভ্যাসগুলো মিশে গিয়ে বিপদকে বাড়িয়ে তোলে।
কেন ভোরে বাড়ে হৃদযন্ত্রের ঝুঁকি?
ডা. ভোজরাজ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন— ভোরবেলায় শরীর ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সর্বাধিক পরিশ্রম করতে শুরু করে। কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গিয়ে হৃদপিণ্ডে চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে রক্তচাপ হঠাৎ বাড়া আর রক্ত ঘন হয়ে ওঠার মতো বিষয় জুড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়। সকালবেলায় যাঁরা হঠাৎ পরিশ্রম করেন বা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়েন, তাঁদের জন্য ঝুঁকি আরও ভয়াবহ।
সকালের কিছু অভ্যাস মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে
ডা. ভোজরাজ জানিয়েছেন, খালি পেটে চা বা কফি খাওয়া, ঘুম ভাঙার পর শরীরকে জল না দিয়ে শুকনো অবস্থায় রাখা, রক্তচাপ বা হৃদরোগের ওষুধ না খাওয়া— এগুলো সবই হার্টের জন্য হুমকির। তার সঙ্গে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার মতো অভ্যাস নীরবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দেয়।
শরীরের স্বাভাবিক চাপের সঙ্গে দ্বৈরথ
মানবদেহের জৈব ঘড়ি অনুযায়ী সকালবেলা শরীরেই স্বাভাবিকভাবে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু সেই অবস্থায় যদি খালি পেটে ক্যাফেইন, হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ বা ওষুধ বাদ দেওয়ার মতো আচরণ যুক্ত হয়, তাহলে ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন— এভাবেই হৃদপিণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
সকালে কী করলে হৃদয় থাকবে সুরক্ষিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই শরীরকে রিহাইড্রেট করতে হবে। অন্তত এক গ্লাস জল খাওয়া উচিত। তার পর নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস রাখতে হবে, বিশেষত যাঁরা দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভুগছেন তাঁদের ক্ষেত্রে। সকালের খাবারে প্রোটিন সমৃদ্ধ হালকা জলখাবার রাখা প্রয়োজন, যাতে শরীরের শক্তি স্থিতিশীল থাকে। পাশাপাশি ১০-১৫ মিনিট হালকা ব্যায়াম— যেমন হাঁটা, স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করলে হৃদযন্ত্র অনেকটা চাপমুক্ত থাকে।
ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২২ সালে সারা বিশ্বে হৃদরোগের কারণে মারা গেছেন প্রায় ১ কোটি ৯৮ লক্ষ মানুষ। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে, হৃদযন্ত্রের যত্ন কোনো বিকল্প বিষয় নয়, বরং সবার জীবনের জন্য অপরিহার্য নিয়ম।
লাইফস্টাইলে বদলেই বাঁচবে প্রাণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধূমপান পুরোপুরি বাদ দেওয়া, সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা— এসবই হার্টকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। সকালে ছোট ছোট ভুলভ্রান্তি যেন আর প্রাণঘাতী না হয়, সেজন্য প্রতিদিনের জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা জরুরি। কারণ একবার হার্ট অ্যাটাক হলে তার ফল ভয়াবহ হতে পারে, অথচ সামান্য সচেতনতাই বাঁচাতে পারে কোটি প্রাণ।