ভারতের সংবিধান রচয়িতা ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর: এক ঐতিহাসিক জীবন ও সংগ্রাম

ভারতের সংবিধান রচয়িতা ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর: এক ঐতিহাসিক জীবন ও সংগ্রাম

ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর ছিলেন ভারতীয় সমাজের এক মহান নেতা, সমাজ সংস্কারক এবং সংবিধানের নির্মাতা। তিনি দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। আম্বেদকর ভারতীয় সংবিধানের খসড়া তৈরি করেছিলেন এবং সামাজিক সাম্য, শিক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রচার করেছিলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে সামাজিক সচেতনতায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন।

বি. আর. আম্বেদকর: ভারতীয় ইতিহাসের এমন ব্যক্তিদের মধ্যে একজন, যিনি সামাজিক সাম্য, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং রাজনৈতিক নেতা। ডঃ আম্বেদকর কেবল শিক্ষা ও আইনের জগতেই নয়, দলিত ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর অধিকারের জন্যও সংগ্রাম করেছিলেন। তাঁকে ভারতীয় সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছিল এবং তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম আইন ও বিচার মন্ত্রী হয়েছিলেন।

আম্বেদকর তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের উদাহরণ নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের লড়াইয়ের প্রতীকও। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে "জয় ভীম" বলে সম্বোধন করেন এবং তাঁকে 'বাবাসাহেব' নামেও ডাকা হয়।

ভীমরাও আম্বেদকরের শৈশব ও পরিবার

ভীমরাও আম্বেদকরের জন্ম হয়েছিল ১৪ই এপ্রিল, ১৮৯১ সালে মধ্যপ্রদেশের মহু নামক শহরে, যা সেই সময় একটি সামরিক ক্যান্টনমেন্ট ছিল। তাঁর পিতা রামজি মালুজি সাকপাল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সুবেদার পদে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁর মা ভীমাভাই সাকপাল গৃহকর্ম সামলাতেন। ভীমরাও ছিলেন তাঁর পিতামাতার চৌদ্দতম সন্তান। তাঁদের পরিবারের মূল নিবাস ছিল রত্নগিরি জেলার আম্বাদাবে গ্রামে।

ভীমরাও মহার জাতিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেটিকে সেই সময় সামাজিকভাবে 'অস্পৃশ্য' বলে মনে করা হত। তাঁর পরিবার দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু তাঁদের সামাজিক জীবনে বর্ণবৈষম্য ও বৈষম্য প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁদের প্রভাবিত করেছিল।

তাঁর শৈশবের শিক্ষা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। স্কুলে তাঁকে আলাদা বসতে হত এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে জল পানের অনুমতি দেওয়া হত। শিক্ষক এবং অন্যান্য ছাত্ররা তাঁর সাথে বৈষম্য করত। এই পরিস্থিতিগুলির উল্লেখ তিনি তাঁর লেখায় করেছেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে তাঁকে "নো চપરાসী, নো ওয়াটার" (কোনো পিয়ন নেই, জল নেই) পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হত।

তাঁর মা তাঁর শৈশবেই মারা যান এবং তাঁর দেখাশোনা তাঁর পিসি করতেন। পরিবারের কষ্টের মধ্যেও ভীমরাও পড়াশোনায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

ভীমরাও আম্বেদকরের শিক্ষা ও বিদেশ অধ্যয়ন

ভীমরাও আম্বেদকরের শিক্ষা তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল। তিনি বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে যান। তিনি অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

বিদেশে অধ্যয়নকালে তিনি সমাজবিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র ও ইতিহাসেও গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয়গুলির মধ্যে ছিল বর্ণবৈষম্য, ভারতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক সংস্কার। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি "Casts in India: Their Mechanism, Genesis and Development" (ভারতে জাতি: তাদের কার্যপদ্ধতি, উৎপত্তি ও বিকাশ) বিষয়ে গবেষণা পত্র উপস্থাপন করেন।

লন্ডনে আইন অধ্যয়ন করার পর, তিনি বোম্বেতে আইন পেশা শুরু করেন। বিদেশে অধ্যয়নের সময় তাঁর বইয়ের সংগ্রহ থেকে কিছু অংশ জাহাজে ডুবে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি এবং লন্ডনে ফিরে এসে তাঁর ডক্টরেট সম্পন্ন করেন।

দলিত অধিকার ও সামাজিক সংস্কার

ভীমরাও আম্বেদকর তাঁর জীবনের দীর্ঘতম অংশ বর্ণবৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি মহাদ সত্যাগ্রহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে দলিতদের সর্বজনীন জলাশয়গুলিতে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

১৯২৭ সালে, তিনি মনুস্মৃতি দহন করেন, যা ভারতীয় সমাজে বর্ণবৈষম্যকে বৈধতা দিত। এই পদক্ষেপটি সামাজিক সাম্য ও দলিত অধিকারের দিকে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও, তিনি কালाराम মন্দির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যেখানে দলিতদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার দেওয়ার জন্য গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল।

দলিতদের উন্নয়নের জন্য ভীমরাও বেশ কয়েকটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেমন কেন্দ্রীয় সংস্থা 'বহিষ্কৃত হিতকারিনী সভা', যার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার এবং দলিতদের অধিকার রক্ষা করা।

আম্বেদকরের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রাম

ভীমরাও আম্বেদকরের রাজনৈতিক জীবনও তাঁর সামাজিক সংস্কারের প্রয়াসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ১৯৩২ সালে তিনি পুনা চুক্তির অধীনে দলিতদের জন্য নির্বাচনে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। এই চুক্তি মহাত্মা গান্ধীর বিরোধিতার পরেও সম্পন্ন হয়েছিল। পুনা চুক্তি দলিতদের আইনসভায় পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছিল।

১৯৩৬ সালে তিনি স্বাধীন শ্রমিক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৩৭ সালের বোম্বে বিধানসভা নির্বাচনে বেশ কয়েকটি আসন লাভ করেন। তিনি বর্ণপ্রথা, খোতি প্রথা এবং অন্যান্য সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে আইনগত ও রাজনৈতিক লড়াই লড়েছিলেন।

সংবিধান নির্মাণে আম্বেদকরের অবদান

ভারতের স্বাধীনতার পর, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁকে আইন ও বিচার মন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এর পাশাপাশি তাঁকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও নিয়োগ করা হয়।

ডঃ আম্বেদকরের নেতৃত্বে ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। তিনি মহিলাদের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করেন এবং তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

সংবিধানসভার সমাপনী ভাষণে ডঃ আম্বেদকর স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে সংবিধান কেবল তাঁর একার নয়, বরং এতে স্যার বি. এন. রাও-এর মতো উপদেষ্টাদেরও অবদান রয়েছে।

আম্বেদকরের বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তর

১৯৫৬ সালে, ডঃ আম্বেদকর হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি দলিতদের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন এবং দলিত বৌদ্ধ আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই পদক্ষেপটি সমাজে সাম্য ও মানবাধিকারের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে।

বর্ণবৈষম্য ও সামাজিক সংস্কারের উপর লেখা

ডঃ আম্বেদকর বহু প্রবন্ধ, পত্রিকা এবং বই লিখেছেন। তাদের মধ্যে প্রধান হলো:

  • জাতিভেদ প্রথার বিনাশ: হিন্দু জাতিব্যবস্থা এবং তার সমালোচনা
  • মুকनायक এবং সমতা জনতা: দলিতদের অধিকার ও সামাজিক সংস্কার নিয়ে পত্রিকা
  • তিনি তাঁর লেখায় বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।

মৃত্যু ও সম্মান

ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরের মৃত্যু হয়েছিল ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৫৬ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৯০ সালে তাঁকে ভারতরত্ন উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আজও তাঁর অনুসারীরা তাঁকে "জয় ভীম" বলে শ্রদ্ধা জানান।

সাম্য ও ন্যায়ের অনুপ্রেরণা

ডঃ আম্বেদকরের জীবন সংগ্রাম, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের প্রতীক। তিনি তাঁর কঠিন শৈশব ও সামাজিক বৈষম্যের মোকাবিলা করেও শিক্ষা, আইন ও রাজনীতিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর জীবন সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পথে এক অনুপ্রেরণার উৎস। আজও ভারতে তাঁর অবদানের প্রভাব দেখা যায়। তাঁর শিক্ষা, চিন্তা ও সংবিধান প্রণয়নের কাজ প্রতিটি ভারতীয়ের জন্য পথপ্রদর্শক।

ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর কেবল একজন নেতা বা বিদ্বান ছিলেন না, বরং তিনি সমাজে পরিবর্তন ও মানবতার সেবার প্রতীক ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টা ভারতীয় সমাজে বর্ণবৈষম্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে সঠিক পথে চালিত করেছে। তিনি দেখিয়েছিলেন যে প্রতিকূলতা ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যেও, শিক্ষা, সংগ্রাম এবং দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব। ডঃ আম্বেদকরের জীবন, তাঁর কাজ এবং তাঁর দর্শন আজও আমাদের সাম্য, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার পথে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর বার্তা কেবল ভারতের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

Leave a comment