দুর্গাপুজো মানেই আলো-ঝলমলে শহর
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো এলেই কলকাতা ও বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আলোর উৎসব। চমকপ্রদ প্যান্ডেল, থিমের ঝলকানি আর আলোকসজ্জার মোহে ভেসে যায় শহর। কিন্তু সেই ঝলমলে আলোর আড়ালেই রয়েছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ— বিদ্যুতের বাড়তি ব্যবহার। রাজ্য বিদ্যুৎ দফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৪ বছরে এই চাহিদা বেড়েছে চোখ ধাঁধানো হারে, যা এবার নতুন রেকর্ড গড়তে চলেছে।
পরিসংখ্যানের কড়া বার্তা
২০১১ সালে মাত্র ২০,৯৭০টি পুজো মণ্ডপ বিদ্যুৎ বোর্ডের কাছ থেকে অস্থায়ী সংযোগ নিয়েছিল। লোড ছিল ২১০ মেগাওয়াট। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই সংখ্যাই দাঁড়িয়েছে ৫০,৫৫০ মণ্ডপে। চাহিদা বেড়ে হয়েছে ১,৩৪৮ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ দফতরের অনুমান, ২০২৫-এ সেই সংখ্যা আরও বাড়বে। শুধু তাই নয়, এই পরিসংখ্যানে কলকাতা ও আশপাশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী CESC–এর তথ্য ধরা হয়নি। অর্থাৎ প্রকৃত চাহিদার পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি
বুধবার বিদ্যুৎ ভবনে জরুরি বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস জানিয়েছেন, নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেকোনও বিপর্যয় সামলাতে মাঠে থাকবে ৭৩,৪১৪ জন WBSEDCL কর্মী এবং ৬,০০০ জন সিইএসসি আধিকারিক। এছাড়া সমস্যার দ্রুত সমাধানে নামানো হচ্ছে ৩,৭০০টি মোবাইল ভ্যান। উৎসবের সময়ে চাহিদা যতই হোক, সাধারণ মানুষের আলো-আনন্দে ঘাটতি না রাখার আশ্বাস দিলেন তিনি।
বিদ্যুতের বাড়তি ব্যবহারের আসল কারণ
বিদ্যুৎ দফতরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এই নজিরবিহীন বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হল রাজ্য সরকারের দেওয়া বিশেষ ছাড়। এ বছর প্রতিটি পুজো মণ্ডপকে মোট লোডের উপর ৮০% ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ফলে বহু ক্লাবই এবার বাড়তি লোডের জন্য আবেদন করেছে। সেই সুযোগেই আলোকসজ্জায় প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে, যা সরাসরি বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
ছাড়ে উৎসাহিত পুজো কমিটি
পুজো কমিটিগুলি জানাচ্ছে, এত বড় অঙ্কের ছাড় না থাকলে এত লোড নেওয়া সম্ভব হত না। বরং আলোর খরচ বাঁচাতে অনেক ক্লাব সীমিত পরিকল্পনায় আটকে যেত। এবার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকেই আলোকসজ্জায় নতুনত্ব আনতে চাইছে। 3D আলোকসজ্জা, লাইট শো, ডিজিটাল ইলিউশন— সবকিছুর জন্য বিদ্যুতের চাপ বাড়ছে বহুগুণে।
নাগরিক জীবনে প্রভাব পড়বে কি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের এই বাড়তি চাপ সরাসরি নাগরিক জীবনে সমস্যার কারণ হতে পারে। উৎসব চলাকালীন ঘন ঘন ট্রিপিং বা ভোল্টেজ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে দফতরের দাবি, কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং হবে। সঙ্গে থাকবে টোল-ফ্রি হেল্পলাইন।
জরুরি যোগাযোগ নম্বর
WBSEDCL-এর গ্রাহকদের জন্য টোল-ফ্রি নম্বর ১৯১২১। এছাড়া হেল্পলাইন ৮৯০০৭৯৩৫০৩ / ৮৯০০৭৯৩৫০৪ সবসময় খোলা থাকবে।CESC-এর ক্ষেত্রেও রয়েছে টোল-ফ্রি নম্বর ১৯১২, সঙ্গে গ্রাহক হেল্পলাইন ৯৮৩১০৭৯৬৬৬ / ৯৮৩১০৮৩৭০০। যেকোনও সমস্যায় দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে উভয় সংস্থা।
চ্যালেঞ্জ বনাম উৎসবের উন্মাদনা
বিদ্যুতের চাহিদা কতটা বাড়ছে তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। তবে সরকারের আশ্বাস, প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত জনবলের সমন্বয়ে উৎসবের আনন্দ নষ্ট হবে না। বিদ্যুৎ দফতরের দাবি, প্রতি বছরই চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু প্রস্তুতিও সে হারে শক্তিশালী হচ্ছে। আর সেই ভরসাতেই উৎসবের মরশুমে ঝলমলে আলোয় ভাসবে কলকাতা সহ গোটা বাংলা।