আমেরিকার দোরগোড়ায় ইসলামাবাদ
বিশ্ববাজারে তামার চাহিদা আকাশছোঁয়া। সেই প্রেক্ষিতেই পাকিস্তান এখন ভরসা রাখছে আমেরিকার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট (এক্সিম) ব্যাঙ্কের উপর। বালোচিস্তান প্রদেশের বিশাল তামার খনিকে ঘিরে শুরু হয়েছে সংস্কারের কাজ। জানা গিয়েছে, এই খনি চালু হলে তা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তামার খনি হিসেবে পরিচিতি পাবে। কিন্তু কাজ এগিয়ে নিতে পাকিস্তানের ‘রেকো ডিক কপার অ্যান্ড গোল্ড মাইন’ সংস্থা ইতিমধ্যেই আমেরিকার কাছে ১০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮৮০ কোটি টাকার ঋণ চেয়ে আবেদন জানিয়েছে।
আমেরিকার সিদ্ধান্ত ২৬ দিনের মধ্যে
পাকিস্তানের আবেদন ঘিরে ইতিমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন। এক্সিম ব্যাঙ্কের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সংস্থাটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দরখাস্ত করেছে। তবে এই প্রস্তাব কার্যকর হবে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পরিচালন পর্ষদের বৈঠকে। আগামী ২৬ দিনের মধ্যেই বোঝা যাবে, পাকিস্তান তাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থ সাহায্য পাবে কি না।
কারা এই খনির অংশীদার?
প্রকল্পটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বহুজাতিক মালিকানা। জানা গিয়েছে, ৫০ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে কানাডার বিখ্যাত ‘ব্যারিক গোল্ড কর্পোরেশন’-এর হাতে। বালোচিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের হাতে রয়েছে ২৫ শতাংশ এবং পাকিস্তান সরকারের কাছে বাকিটা। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে ৮৫ কোটি মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৭৫০০ কোটি টাকা ঋণ মিলেছে। এবার নজর সেই আমেরিকার ব্যাঙ্কের দিকে।
অর্থ কোথায় খরচ হবে?
সংস্থার দাবি, ঋণ মেলে গেলে তা মূলত খনির পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। সোলার প্যানেল বসানো, ভারী ট্রাক কেনা এবং খনির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার মতো কাজে ব্যয় হবে এই অর্থ। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি সংস্থার সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিও করেছে পাকিস্তান। খনির প্রযুক্তি, পরামর্শ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করবে এই সংস্থাগুলি।
তামা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা
আধুনিক পৃথিবীতে তামা এখন অমূল্য সম্পদ। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে নবায়নযোগ্য শক্তি, টেলিকম বা ইলেকট্রনিকস—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তামার গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্বশক্তি আমেরিকার নজর গিয়েছে পাকিস্তানের এই খনির দিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা যদি ঋণ দিতে সম্মত হয়, তবে তার বিনিময়ে ওই খনি থেকে উত্তোলিত তামায় ভাগ বসাতে পারে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহ নিয়ে জল্পনা
আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন, তামার মতো খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চাবিকাঠি। পাকিস্তানের খনিকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রশাসনের আগ্রহও তাই অস্বাভাবিক নয়। সম্প্রতি মার্কিন আদালতের নির্দেশে অ্যারিজোনায় একটি তামা প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। তখনই ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, “এ রায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের স্বার্থরক্ষা করছে।” বিশ্লেষকদের মতে, সেই ব্যর্থতার পরই পাকিস্তানের দিকে নজর আরও তীব্র হয়েছে।
বছরে কত তামা মিলবে?
প্রাথমিক হিসেবে ধরা হচ্ছে, বালোচিস্তানের এই খনি থেকে বছরে প্রায় ৮০ হাজার টন তামা উত্তোলন সম্ভব। ভারতের মোট উৎপাদন ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ হাজার টনে। তুলনায় পাকিস্তানের এই প্রকল্প শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, গোটা বিশ্ববাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ভৌগোলিক গুরুত্ব ও অস্থিরতা
তবে সবটাই মসৃণ নয়। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বালোচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘাতে জর্জরিত। প্রায়ই পাক সেনা ও স্থানীয় বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় মাপের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কি ওই অঞ্চলে শান্তি আনবে নাকি নতুন করে অশান্তি ডেকে আনবে?
ট্রাম্পের তৈলভান্ডার প্রসঙ্গ
কয়েক দিন আগে পাকিস্তানের ‘বিশাল তৈলভান্ডার’-এ যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। যদিও বাস্তবে পাকিস্তানে এমন কোনও ভান্ডার রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরেই ইসলামাবাদ তেল খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে দেশটির আমদানির বৃহত্তম অংশ জুড়ে রয়েছে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য। প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি বিদেশ থেকে আসে। তার ফলে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জর্জরিত হয় গোটা দেশ।
অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের বাজি
অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে থাকা পাকিস্তানের জন্য এই খনি প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে গেমচেঞ্জার। তবে ঋণ যদি মেলে, তার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ হবে, তা নিয়েই সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মনে। অনেকেই মনে করছেন, একদিকে যেখানে পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছে, অন্যদিকে এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রকল্পে ভরসা রাখা মানেই একপ্রকার ভবিষ্যতের বাজি ধরা।