প্যারাসিটামল ও পেইনকিলার অজান্তেই শরীরের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ

প্যারাসিটামল ও পেইনকিলার অজান্তেই শরীরের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ

যন্ত্রণায় ওষুধের ওপর নির্ভরতা

শরীর সামান্য ব্যথা বা অস্বস্তি হলেই অনেকেই বিনা দ্বিধায় প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন খেয়ে নেন। মাথা ধরলেই একটুখানি ট্যাবলেট, জ্বর এলে গলাধঃকরণ – যেন রোজকার অভ্যাসের মতো। কিন্তু ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়াই এমনভাবে ওষুধ খাওয়া দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা।

সাধারণ ওষুধ, অচেনা ক্ষতি

প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেন এমন ওষুধ যা বেশিরভাগ মানুষ নিয়মিত খেয়ে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ অস্ট্রেলিয়ার নতুন গবেষণায় জানা গিয়েছে, এই ধরনের ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ জীবাণু ক্রমশ ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে ভবিষ্যতে সংক্রমণ নিরাময় আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিককে দুর্বল করছে ব্যথানাশক

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন অতিরিক্ত খেলে শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে যখন কেউ সংক্রমণ সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক খায়, তখন সেই ওষুধ আর কার্যকর থাকে না। অর্থাৎ সাধারন ব্যথার ওষুধই মারাত্মক অ্যান্টিবায়োটিককে দুর্বল করে দিচ্ছে।

চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক ফলাফল

বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখেছেন, নন-অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেন যখন অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও সাধারণ জীবাণু ইশেরিশিয়া কোলাইয়ের সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়, তখন জীবাণুর জেনেটিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটে। ফলে জীবাণুগুলি অনেক দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সংক্রমণ সারানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জীবাণুর মিউটেশন বাড়াচ্ছে পেইনকিলার

গবেষণার ফলাফলে আরও জানা গেছে, শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে জীবাণু ধীরে ধীরে প্রতিরোধী হয়। কিন্তু ব্যথানাশক সঙ্গে থাকলে জীবাণুর জেনেটিক মিউটেশনের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে সংক্রমণ সারাতে যেসব ওষুধ কার্যকর ছিল, সেগুলিও আর কাজ করে না।

গবেষকের সতর্কবার্তা

স্টাডির প্রধান গবেষক ড. রিইটি ভেন্টার জানিয়েছেন, এতে শুধু সিপ্রোফ্লক্সাসিন নয়, অন্য অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিও জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। ব্যথানাশক ওষুধ জীবাণুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে, যার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার কোষে ঢুকতেই পারে না। এভাবে সংক্রমণের চিকিৎসা অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বয়স্ক মানুষ ও যারা একসঙ্গে অনেক ধরনের ওষুধ খান, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। বৃদ্ধ বয়সে সাধারণত ব্যথার ওষুধ, ঘুমের ট্যাবলেট, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ইত্যাদি একসঙ্গে দেওয়া হয়। এতে জীবাণুর সামনে একসঙ্গে নানা ওষুধ চলে আসে, যা তাদের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়, দায় সাধারণ ওষুধেরও

এই গবেষণা প্রমাণ করছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারেই হচ্ছে না। বরং প্রতিদিন ব্যবহৃত সাধারণ ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেনও বড় ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ আমরা অজান্তেই জীবাণুকে শক্তিশালী করে তুলছি।

ওষুধের কম্বিনেশনে সাবধানতা প্রয়োজন

গবেষকরা জানিয়েছেন, রোগী ও চিকিৎসক উভয়েরই উচিত ওষুধের মিশ্রণ নিয়ে বিশেষ খেয়াল রাখা। অনেক সময় বিভিন্ন ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ার ফলে প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দ্রুত গড়ে ওঠে। তাই কোন ওষুধের সঙ্গে কোন ওষুধ নেওয়া নিরাপদ, আর কোন কম্বিনেশন বিপজ্জনক – তা জানার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

নতুন এক সতর্কবার্তা

এই গবেষণা বিশ্বজুড়ে মানুষের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার শুধু আমাদের শরীরের ক্ষতি করছে না, আশপাশের জীবাণুকেও বদলে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়

সবশেষে গবেষকদের বার্তা একটাই – চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনও ওষুধ খাবেন না। সামান্য ব্যথা বা জ্বর হলেই ট্যাবলেটের দিকে না ছুটে স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও পরামর্শ নেওয়া উচিত। ওষুধ বাঁচিয়ে রাখবে কেবল তখনই, যখন আমরা তার সঠিক ব্যবহার করব।

Leave a comment