ছবির গ্রাম বংশীবেরা একবার গেলে বারবার টানবে মন দুর্গাপুরের অজানা রত্ন

ছবির গ্রাম বংশীবেরা একবার গেলে বারবার টানবে মন দুর্গাপুরের অজানা রত্ন

অজানা সৌন্দর্য দুর্গাপুরের পাশেই

দুর্গাপুর শহরের ব্যস্ত রাস্তা, কারখানা আর ধোঁয়ার বাইরে অচেনা এক গ্রাম লুকিয়ে আছে প্রকৃতির কোলে। নাম বংশীবেরা। এখানে গেলে মনে হবে রঙের ক্যানভাসে পা রেখেছেন আপনি। প্রতিটি দেওয়ালে আঁকা আছে নানান পটচিত্র, প্রতিটি রঙ যেন জীবনের গল্প বলছে। তাই যারা একবার এসেছেন, তাঁদের টানে বারবার আসতে।

আদিবাসী গ্রাম থেকে শিল্পের আঁতুড়ঘর

এই গ্রাম দুর্গাপুরের এক নম্বর ওয়ার্ডের নাচন ড্যামের কাছে অবস্থিত। ঘন সবুজ জঙ্গল ঘেরা জায়গাটি আগে ছিল অভাব আর কুসংস্কারের আঁধারে ঢাকা। অধিকাংশ মানুষ ছিলেন দিনমজুর, ঠিকা শ্রমিক। সামান্য রোজগার আর অনিশ্চয়তায় কাটত তাঁদের জীবন। অথচ সেই সাধারণ গ্রামই আজ শিল্প ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে।

এক দম্পতির উদ্যোগে বদলে গেল ভাগ্য

গ্রামের এই রূপান্তরের গল্প যেন সিনেমার মতো। জীবনবীমা নিগমের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী কমলেন্দু ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী একদিন এখানে এসে মুগ্ধ হন। সরল মানুষদের আন্তরিকতা আর অতিথিপরায়ণতায় তাঁরা এতটাই আবেগপ্রবণ হন যে, গ্রামকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প করেন। তাঁদের এই উদ্যোগই পরে বদলে দিয়েছে গোটা বংশীবেরা গ্রামকে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাঠে নতুন জাগরণ

প্রথমেই গ্রামবাসীদের শেখানো হয় স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব। লাগানো হয় ফুল ও ফলের গাছ, সাজানো হয় গ্রামটিকে নতুন করে। শান্তিনিকেতন থেকে শিল্পী এনে প্রতিটি ঘরের দেওয়ালে আঁকা হয় বর্ণময় চিত্রকলা। পাশাপাশি আদিবাসী মহিলাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বীজ ও চারা তৈরি করার দায়িত্ব। ঢেঁকিতে চাল উৎপাদনের মতো উদ্যোগ চালু করে আয়ের নতুন পথও খুলে দেওয়া হয়।

প্রতিটি দেয়ালেই আঁকা জীবনের রঙ

আজ বংশীবেরায় প্রবেশ করলে চারপাশের দেওয়ালে যেন ছড়িয়ে আছে জীবনের নানা রঙ। কখনও প্রকৃতির ছবি, কখনও উৎসব, আবার কখনও লোকসংস্কৃতির চিত্র—সব মিলিয়ে যেন খোলা আকাশের নীচে এক বিশাল গ্যালারি। প্রতিটি বাড়িই একেকটি শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থীরা তাই অবাক হয়ে যান এই সৃজনশীলতার ছোঁয়ায়।

বাঁধনা উৎসবে বাড়তি রঙের ছোঁয়া

আদিবাসী সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব বাঁধনা পরবকে ঘিরে এই গ্রামে জমে ওঠে উৎসবের আমেজ। উৎসবের আগে গ্রামের কচিকাচা থেকে যুবক-যুবতীরা আবার নতুন করে তুলি হাতে তুলে নেয়। আঁকা হয় নতুন ছবি, পুরোনো রঙের ঝলক বাড়ানো হয় আরও উজ্জ্বল করে। উৎসবের দিনে গ্রাম ভরে যায় দর্শনার্থীদের ভিড়ে।

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নিখুঁত গন্তব্য

শুধু শিল্প নয়, প্রকৃতির সৌন্দর্যও এই গ্রামকে দিয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। নাচন ড্যামের নীল জল, চারপাশের সবুজে ঘেরা পরিবেশ, আর তার সঙ্গে রঙিন ছবির গ্রাম—সব মিলিয়ে মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য ঠিকানা। উইকেন্ডে কিংবা ছুটির দিনে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে এখানে সময় কাটাতে আসলে মন ভরে যাবে নিশ্চয়ই।

শিল্প, সংস্কৃতি আর মানবতার সমন্বয়

আজ বংশীবেরা শুধু একটি গ্রাম নয়, এক শিক্ষা। কিভাবে ইচ্ছাশক্তি ও উদ্যোগের মাধ্যমে অভাবের আঁধার কেটে ফেলে নতুন স্বপ্ন আঁকা যায়—সেই গল্পই বলছে এই জায়গা। গ্রামবাসীদের পরিশ্রম, এক দম্পতির উদ্যোগ আর শিল্পের মেলবন্ধনে জন্ম নিয়েছে এই ছবির গ্রাম। দর্শনার্থীদের মনে তাই প্রতিবারই থেকে যায় এক অমলিন ছাপ।

Leave a comment