ডলার–টাকার রেকর্ড ফারাক
ভারতীয় মুদ্রা ফের বড় ধাক্কা খেল। শুক্রবার মার্কিন ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম নেমে দাঁড়াল ৮৮.২৮ টাকায়। অর্থাৎ এই প্রথমবার টাকার দর ৮৮ টাকার গণ্ডি ভেঙে গেল। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে টাকার দর ছিল ৮৭.৯৫, সেই রেকর্ডকেও পিছনে ফেলে দিল এদিনের পতন। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ শতাংশ দুর্বল হয়েছে টাকা, যা এশিয়ার বিভিন্ন মুদ্রার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স।
ট্রাম্প ট্যারিফে নাজেহাল ভারতীয় অর্থনীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার নজিরবিহীন পতনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতির। ওয়াশিংটন ভারতীয় রপ্তানিপণ্যের উপর এক লাফে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করায় বাজারে ধাক্কা লেগেছে।
শেয়ারবাজারে প্রভাব, সেনসেক্স–নিফটি নামল
টাকার এই ধস শেয়ারবাজারকেও অস্থির করেছে। শুক্রবার সকালে সেনসেক্স ও নিফটি50 সূচক সামান্য বাড়লেও দিনের শেষে দেখা গেল বড় পতন। বাজারে লগ্নিকারীরা ইতিমধ্যেই সেল-অফ মুডে চলে গিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যারিফ ও মুদ্রার পতন একসঙ্গে চলায় এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
ডলারের পাশাপাশি ইউয়ানের নিরিখেও ধস
শুধু মার্কিন ডলার নয়, চীনা মুদ্রা ইউয়ানের সাপেক্ষেও ভারতীয় টাকা দুর্বল হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ ভারত–চিনের মধ্যে আমদানি–রপ্তানি সম্পর্ক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। টাকার দাম কমার ফলে এখন চিন থেকে আমদানি খরচ আরও বেড়ে যাবে।
ইকোনমিস্টের সতর্কবার্তা
আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের ইকোনমিস্ট গৌর সেনগুপ্ত এ বিষয়ে বলেন, “টাকার এই পতন ও ইউয়ানের সঙ্গে ব্যবধান বৃদ্ধির কারণে ভারতের রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা আসতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ট্রাম্পের ট্যারিফ চাপ। সব মিলিয়ে ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য খাত প্রবল সমস্যায় পড়তে চলেছে।”
লগ্নিকারীদের অস্বস্তি চরমে
মুদ্রার এই দুর্বলতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে লগ্নিকারীদের মনে। তারা ভারতীয় বাজার থেকে পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন এবং তুলনায় স্থিতিশীল মুদ্রার দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডারে চাপ তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, টাকার এই ধস যদি আরও কয়েকদিন চলতে থাকে তবে আমদানি নির্ভর সেক্টর, যেমন জ্বালানি, ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ শিল্প ভয়ঙ্করভাবে চাপে পড়বে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়বে দৈনন্দিন খরচ, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম পরোক্ষভাবে বেড়ে যাবে।
২০২৫ সালের সবচেয়ে খারাপ রেকর্ড
এ বছর এশিয়ার মুদ্রাগুলির মধ্যে ভারতীয় টাকা ইতিমধ্যেই সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, শেয়ারবাজার অস্থির, আর ট্যারিফের কারণে রপ্তানি ব্যাহত। অর্থনীতির এই ত্রিমুখী আঘাত ভারতের আর্থিক পরিকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা।
সার্বিক চিত্র ভয়াবহ
সব মিলিয়ে ভারতীয় মুদ্রার এই রেকর্ড পতন কেবল বাজারের বিষয় নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। সামনে উৎসবের মরশুম, আমদানির চাপ বাড়বে। সেই প্রেক্ষিতে টাকার এই দুর্বলতা সাধারণ মানুষের পকেটেও আগুন ধরাতে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।