আগামী বছর গোড়াতেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। সেই ভোটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সরগরম রাজ্য রাজনীতি। শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক তরজার মাঝেই এবার প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। বুথ সংস্কার, নতুন বুথ তৈরির পরিকল্পনা এবং খরচ নিয়ন্ত্রণকে সামনে রেখেই শুরু হয়েছে নয়া প্রস্তুতি।
বুথ সংস্কারে নজর
প্রতিটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের পরিকাঠামো নিয়ে সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দীর্ঘদিন ধরে বহু বুথে জানালা-দরজা ভাঙা, শৌচালয়ের অভাব, পানীয় জলের সংকট এবং বিদ্যুতের অপ্রতুলতা নিয়ে অভিযোগ আসছিল। এবার আর শেষ মুহূর্তের কাজ নয়, ভোটের অনেক আগেই সংস্কারের পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে কমিশন।
ম্যাকিনটশ বার্ন পেল দায়িত্ব
রাজ্য সরকারেরই একটি সংস্থা, দ্য ম্যাকিনটশ বার্ন-কে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বুথ ঘুরে বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখবে তারা। কোথায় কী ধরনের সংস্কার দরকার, কতখানি খরচ পড়বে—সব বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেবে সংস্থাটি। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই অর্থ দফতর টাকা বরাদ্দ করবে এবং বুথ সংস্কারের কাজ এগোবে।
বুথের সংখ্যা বাড়ছে
বর্তমানে রাজ্যে বুথের সংখ্যা ৮০ হাজার ৬৮১। তবে নির্বাচন কমিশনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একটি বুথে সর্বাধিক ১২০০ ভোটার রাখা যাবে। ফলে আরও প্রায় ১৪ হাজার বুথ বাড়ানো প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই জেলা নির্বাচন আধিকারিকেরা এই নতুন বুথ চিহ্নিত করে ফেলেছেন। অর্থাৎ ভোটের আগে বুথের সংখ্যা এক লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছতে চলেছে।
সর্বদলীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত
শুক্রবার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক সর্বদলীয় বৈঠক ডাকবেন। নতুন বুথ তৈরির পাশাপাশি পুরনো বুথ সংস্কার নিয়ে সেখানে বিস্তারিত প্রস্তাব পেশ হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি পাঠানো হবে নির্বাচন কমিশনে। রাজনৈতিক দলগুলির মতামত নিয়েই শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চান আধিকারিকেরা।
সরকারি ভবনেই নতুন বুথ
প্রথা মেনে সরকারি স্কুল, লাইব্রেরি, কমিউনিটি সেন্টারের মতো ভবনেই নতুন বুথ তৈরি করা হবে। কিন্তু এই ভবনগুলির বেশিরভাগই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক সময় ভোটারদের বসার জায়গা, শৌচালয় কিংবা প্রবীণ ও শারীরিকভাবে বিশেষভাবে সক্ষম ভোটারদের প্রবেশের জন্য র্যাম্প পর্যন্ত থাকে না। ফলে ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অতীতের সমস্যার সমাধান
আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, এতদিন ভোটের সময় স্থানীয় সরকারি আধিকারিকদের উপর বুথ সংস্কারের চাপ পড়ত। তখন প্রায়ই সময়ের অভাবে কাজ ঠিকঠাক হত না। খরচের সাযুজ্যও থাকত না। কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে, কোথায় কী সংস্কার হয়েছে—তার কোনও তথ্যভাণ্ডারও ছিল না। এবার সেই ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।
তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে
এবার থেকে প্রতিটি বুথে কী কী সংস্কার হল, কত খরচ হল, সব তথ্য নথিভুক্ত করা হবে। যাতে পরবর্তী নির্বাচনে আবার কোনও সমস্যা দেখা দিলে পুরনো রেকর্ড দেখে সমাধান করা যায়। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী তথ্যভাণ্ডারও তৈরি হবে, যা বাংলার ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক বলেই মনে করা হচ্ছে।
খরচ নিয়ন্ত্রণে কড়া নজর
ভোটের সময় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। শুধু বুথ সংস্কারেই যায় কোটি কোটি টাকা। এবার আগেভাগে সমীক্ষা করে বাজেট নির্ধারণ করলে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে বলে মনে করছেন আধিকারিকেরা। একইসঙ্গে ভোট চলাকালীন প্রশাসনিক চাপও অনেকটা কমে যাবে।
রাজনীতি বনাম প্রশাসন
বিধানসভা ভোট ঘনিয়ে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে। তবে নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করছে, শুধু রাজনীতিই নয়, ভোটকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনও সমানতালে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী বছরের শুরুর দিকেই যে বাংলার ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, তা নিয়ে সংশয় নেই কারও। তার আগেই বুথ সংস্কার ও পরিকাঠামো উন্নয়ন নিঃসন্দেহে ভোট প্রক্রিয়াকে মসৃণ করতে সাহায্য করবে।